২৯/০৯/২০২৩

শ্রীচরণেষু মা

আজ সকালে আসনে বসে স্পষ্ট কথায় তোমাদের কাছে প্রার্থনা করে ফেললাম। নিজের জন্যই চাইলাম, মা। গুরুমহারাজের স্পর্শ পাওয়া পবিত্র আসনে বসে নিজের জন্যই চাইলাম। আমি নিরুপায়, মা। হয়তো তোমাদের সন্তান হয়ে আমার এই চাওয়া সম্পূর্ণ অনুচিৎ। আমার এই চাওয়ায় ঠাকুর এবং স্বামীজী যে খুশি হবেন না, অনুমান করতে পারি। তুমিও নিশ্চয়ই আমায় খারাপ ভাবছো। কিন্তু আমি একেবারে অসহায়, নিরুপায় হয়ে আজ এত স্পষ্ট ভাবে তোমাদের থেকে চাইলাম।

আমার জন্য চাইলাম, কারণ আমি এই জীবনে দুর্ভাবনামুক্ত হয়ে তোমাদের সাধনা, সেবা করতে চাই – সে আমার সীমিত সাধ্যে যতটুকুই সম্ভব হোক না কেন। এই বছরের শুরু থেকে এখনও অব্দি বয়ে বেড়ানো সাঙ্ঘাতিক সংসারের দুশ্চিন্তা, ভয়, অনিশ্চয়তা, প্রিয় মানুষদের অখুশি রাখার গ্লানি আমাকে শেষ করে দিচ্ছে মা। জপ করছি, সে-ও যন্ত্রের মতো। সময়ে, অসময়ে, যে কোনও কাজের মাঝে সেই চিন্তা এলে প্রচণ্ড ভয় গ্রাস করছে, হৃদয় সঙ্কুচিত হয়ে যাচ্ছে। আমার ভাগ্যে কি তোমাদের নিরলস সেবা ও সাধনা লেখা নেই, মা? আমি তো তোমাদের ভালোবাসবো বলে চাইছি। তা কি ভুল? আমি তো পার্থিব সম্পদ চাইছি না। আধ্যাত্মিক পথে থাকার জন্য মনে শান্তি চাইছি। তা দেওয়া কি একটুও সম্ভব নয়? আমি তো একার জন্যও চাইছি না। যেন দুজন একসঙ্গে থাকি, এবং তোমাদের প্রসঙ্গ, তোমাদের সেবায় বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে পারি। এই প্রার্থনা কি খুব অসঙ্গত মা?

সন্ন্যাসী হওয়ার মতো, সংসারত্যাগী হওয়ার মতো দৃঢ়, কঠোর মন দিয়ে তো এবার আমায় তৈরি করো নি, মা। যাদের সঙ্গে আছি, তোমাদের পথে চলার আগে যাঁদের সঙ্গে আমার এই জীবন জড়িয়ে গেছে, তাঁদেরকে ফেলে এগিয়ে যাওয়ার মতো জোর তো আমার নেই, মা। সে কাজ করলে আমার নিজেকে হৃদয়হীন, নৃশংস মনে হবে। সেই ভাব তো আমাকে তোমাদের পথে এগিয়ে দেবে না, মা।

তাহলে কি এই জন্মে আমার তোমাদের পথে এগোনো ভাগ্যে নেই? এ জন্ম তাহলে এই শাস্তি পেয়ে নিজেকে আরও শক্ত করে তোলার জন্যই লেখা আছে? তাহলে তোমাদের প্রতি এরকম ভালোবাসা দিলে কেন, মা? এত দ্বিধান্বিত, ভালোবাসতে চাওয়া মন কেন দিলে, মা? সংসারের এত দহনে যদি রাখবে, এত ব্যাকুলতা কেন দিলে মা? সংসারও রাখতে পারবো না, তোমাদেরও ছুঁতে পারবো না। কী লাভ হলো এমন জীবন পেয়ে, মা?

আমি পালাবো না জীবন ছেড়ে। যেভাবে হোক, থেকে যাবো। কিন্তু তোমাদের কাছে এসেছি, তোমরা সন্তান বলে ঠাঁই দিয়েছো, তাই এইটুকু চেয়েছি মা। আমি কোনওদিন সম্পদ, মান, যশ, খ্যাতি, কাম চাইবো না তোমাদের কাছে, সে তোমরাও জানো। আমি সংসারে শান্তি চাইছিই, জমিয়ে সংসার করবো বলে নয়। শান্তি চাইছি, যাতে এই জন্মে সংসারে থাকা লেখা আছে যখন, থেকে তোমাদের সেবা করতে পারি নিশ্চিন্তে। আমি মনের মিল চাইছি, যাতে সংসারে দুজনের থাকা সার্থক হয় তোমাদের সেবায়।

দেখছো তো মা, সে-ও কেমন কষ্ট পাচ্ছে? আমার চেয়ে অনেক, অনেক বেশি দহন তার। একেবারে জ্বলে পুড়ে যায় সময়ে সময়ে। আমি দেখতে পারি না মা। কী করবো বুঝতে পারি না। তার মন এখনও তোমাদের পথে আসেনি। কিন্তু আমার মন তো এসেছে। আমি তো তোমাদের পথেও আছি, তার কাছেও আছি। তার জন্য এটুকু চাইবো না, মা? এ কি খারাপ কোনও চাওয়া? তোমাদের ভাবে একটি মানুষকে তোমরা যদি টানো, তার কষ্ট কি বাড়বে আর? একটু তো শান্তি পাবে। শান্তি ফিরে আসবে। ভুল বোঝার ভার কমবে। কিছু তো নষ্ট হবে না, মা। আমি আর কী করবো, বুঝি না। অসহায় লাগে। তোমার কাছে চাওয়া ছাড়া আর কী করবো আমি। আমাদের জন্য তাই চাইলাম আজ।

তুমি ঠাকুরকে, স্বামীজীকে বোলো একটু। রাজা মহারাজকে বোলো। আমার চাওয়ায় যদি অসততা না থাকে, একটু দেখো মা। কী আর বলবো...

Comments

Popular Posts